Thursday , October 7 2021

কারাগার থেকে আকবর যে প্রস্তাব দেন নিহত রায়হানের পরিবারকে

সিলেটে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিহত যুবক রায়হান আহমদ হ’ত্যা মামলার প্রধান আসামি পুলিশের বরখাস্তকৃত পুলিশের বহিষ্কৃত উপ-পরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূইয়া নিহত রায়হানের স্ত্রীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর আগে রায়হানের মায়ের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলেন রায়হানের ঘাতক আকবর। একই সঙ্গে রায়হানের মা ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেওয়া অভিযোগপত্রেও আকবরকে আসামি করা হয়েছে। রায়হানকে হ’ত্যার অভিযোগে করা মামলার প্রধান আসামি আকবর হোসেন। এই মামলায় কারাগারে আছেন আকবর। জেল থেকেই তিনি এমন প্রস্তাব দেন।

বিয়ের প্রস্তাবের বিষয়ে নিহত রায়হানের মা একটি ফেসবুক পেইজে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে এ তথ্য জানান।

গত শনিবার তাকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ ভাইরাল হয়ে যায়।

নিহত রায়হানের মা একটি ফেইসবুক পেইজের লাইভে জানান, প্রশাসনের এক ব্যক্তিকে দিয়ে আমার বউমাকে সে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠায়। পাশাপাশি আমার বউমা, নাতি, ও আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিবে বলে জানায়। আমি তার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি।

তিনি বলেন, আদালতে আসার পর সে আমার কাছে পা ধরে মাফ চেয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। এর আগে গত বছরের ১১ অক্টোবর রাত ৩টার দিকে রায়হানকে সিলেট কোতোয়ালি থানার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। নির্যাতনে রায়হান মারা যান। এ ঘটনায় তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি পরদিন হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। আকবর প্রতিবেশি দেশ ভারতে পালিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। বর্তমানে সে জেলে আছে।

২০২০ সালের ১১ অক্টোবর ভোরে সিলেট নগরের আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে (৩৩) কাষ্টঘর এলাকা থেকে ধরে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করেন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াসহ পুলিশ সদস্যরা। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। হত্যার পরদিন ১২ অক্টোবর তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

আকবরকে কখনো ক্ষমা করব না জানিয়ে সালমা বেগম বলেন, ‘তিনি আমার নিরপরাধ ছেলেকে খুন করেছেন। তাকে আমি কখনোই ক্ষমা করব না। আমাদের ভরণপোষণের চিন্তা করতে হবে না। পারলে তিনি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিক।’ রায়হান যখন মারা যান তখন তার মেয়ে আলফার বয়স ছিল দুই মাস। সেই মেয়ে এখন বড় হয়ে উঠছে। হাঁটা শিখছে। ধীরে ধীরে কথাও ফুটছে তার মুখে।

সালমা বেগম বলেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার কাজে আদালতে গিয়েছিলাম। এসে দেখি নাতনিটা কেবল বাবা বাবা করছে। সব সময়ই সে বাবাকে খোঁজে। কিন্তু পায় না। তার জন্য বুক ফেটে যায়। এই শিশুকে যে এতিম করেছে তাকে কী করে ক্ষমা করব? আকবরসহ অন্যরা অপরাধ না করে থাকলে কেন ক্ষমা চাইবে এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘তাদের এই ক্ষমা প্রার্থনা আর বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাবই প্রমাণ করে তারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে।’

২০২০ সালের ১১ অক্টোবর রাতে সিলেট নগরের আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভোরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় সিলেট এম এ জি ওসমানী হাসপাতালে। সেখানে সকালে তিনি মারা যান।

পরিবার রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ তোলে। এ ঘটনায় তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। গত ৫ মে এই মামলায় ৫ পুলিশ সদস্যসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই। ৩০ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আদালত।

অভিযুক্তরা হলেন- বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়া, এসআই হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটুচন্দ্র দাস, হারুনুর রশিদ ও কথিত সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান।

রায়হানের মৃত্যুর পরই পালিয়ে যান এসআই আকবর। গেল বছরের ৯ নভেম্বর দুপুরে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের ডোনা সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এখন অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্য কারাগারে থাকলেও নোমান পলাতক।