Wednesday , June 16 2021

গায়ের রং নিয়ে অনেক ‘অপমানিত’ হয়েছিলেন,সেই আশিষ বিদ্যার্থী ‘বলিউডকে’ এনে দিয়েছিলেন ‘জাতীয় পুরস্কার’

বলিউডে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন
আশিস বিদ্যার্থী। খলনায়কের চরিত্রে তার অভিনয় দেখার জন্য এখনো দর্শক ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু অভিনেতার এই অসাধারণ অভিনয় দক্ষতাকে সঠিকভাবে বলিউড ব্যবহার করতে পারেনি এবং তাঁকে যোগ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে পারেনি আর তাই নিয়ে অনেকেরই কম বেশি আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে। ১৯৬৫ সালে অভিনেতা জন্ম হয়। দিল্লির করোলবাগে ভাড়াবাড়ির একটি ছোট ঘরে তার ছোটবেলার দিনগুলো কেটেছে। অভিনেতার বাবা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।






আশিস সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির আর্কাইভ কয়েক বছর কাজ ও করেছিলেন। তার মা ছিলেন প্রবাসী বাঙালি। তিনি ছিলেন বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আর তাই শৈশব বা ছোটো বেলাটা তার কেটেছে নিঃসঙ্গতায়। স্কুলে কোনও দিনই তার পড়াশোনায় মন বসেনি।

তার শুধুমাত্র ভাল লাগার একটাই জায়গা ছিল অভিনয়-সহ শিল্পের অন্যান্য ধারা এমন কি মাঝে মাঝে তিনি তার মায়ের সঙ্গে কত্থক নাচেও পা মেলাতেন, আর কলেজে পৌঁছে তার মনে জোরকদমে চেপে বসল অভিনয়ের নেশা। কলেজ জীবনে তার শৈশবের নিঃসঙ্গতা দূর হয়েছিল, তিনি ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র। অভিনেতার কলেজ জীবনের বিশেষ বন্ধু ছিলেন মনোজ বাজপেয়ী এবং বিশাল ভরদ্বাজ।

১৯৮৬ সালে তিনি স্নাতক হওয়ার পরে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা বা এনএসডি-তে ভর্তি হয়েছিলেন। এতদিন থিয়েটারের শখ থাকলেও এনএসডি-তে গিয়ে তার পরিচয় হয়ে ছিল বিশ্বের সিনেমার সঙ্গে। অভিনয়ে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তাঁকে উপার্জন করার কথাও ভাবতে হতো কারণ তাঁর জন্মের সময় তাঁর বাবার বয়স ছিল ৫৩ বছর, আর তাই তিনি যখন এনএসডি-তে অভিনয় শিখতেন তার বাবা মা দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন।

আর তাই সংসার এর সব দায়িত্ব এসে পড়েছিলো তার ওপরে। আর তাই তিনি ১৯৯২ সালে কাজের খোঁজে দিল্লি থেকে মুম্বই চলে এসে ছিলেন। আর সেই সময় ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং ডিরেক্টরদের কাজ করার খুব বেশি রীতি ছিল না।






তাঁকে কাজের জন্য ঘুরতে হত প্রযোজকদের দরজায় দরজায়। কিন্তু তার কাজ পেতে সমস্যা হত এবং তাঁকে অনেক খারাপ মন্তব্য শুনতে হত তার গায়ের রং এর জন্য। তবে সব অপমান সহ্য করে করে নেন তিনি, কারণ ছোট বেলা থেকেই তাঁকে ‘কালু’, ‘জল্লাদ’-এর মতোন নামে ডাকা হত তার নামের বদলে। এখানেই শেষ নয় অভিনয় জগতে ও তাঁকে শুনতে হয়েছে , পর্দায় তাঁর গায়ের রং ভাল লাগবে না, কিন্তু অপমানকে তিনি গায়ে মাখননি বরং, তিনি সব উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন।

১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম বড় পর্দায় কন্নড় ছবি ‘আনন্দ’-এ অভিনয় করেছিলেন। কাল সন্ধ্যা’ ছবিতে অভিনয় করা ছিল বলিউডে করা প্রথম কাজ তার। । ১৯৯১ সালে কাজ শুরু হওয়ার পরে সেই ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এছাড়াও তিনি ১৯৪২ এ লাভ স্টোরি’-তে আশুতোষের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিলো তাঁকে।

কেতন মেহতা তার ছবিতে অভিনেতা আশিসকে সুযোগ দিয়েছিলেন তার ‘সর্দার’ ছবিতে। তিনি অভিনেতার অভিনয় বেশ পছন্দ করতেন। তবে অভিনেতা গোবিন্দ নিহালনীর ছবি ‘দ্রোহকাল’ এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শক মহলে বেশি জনপ্রিয়তা পান। ১৯৯৪ সালে তিনি এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।

এর পর আর তাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি, মহেশ ভট্টের ছবি ‘নাজায়েজ’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি মুম্বইয়ের বাণিজ্যিক ছবিতে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন। এর পর সমান্তরাল ছবির পাশাপাশি বাণিজ্যিক ছবিতে ও তার অভিনয় বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। খলনায়কের ভূমিকায় অভিনেতার অভিনয় ছবিতে নায়ক নায়িকা বা অন্য চরিত্রে অভিনয়রত তারকাদের সমান তালে টেক্কা দিত।






তবে বলিউডে কাজ করার পর ও তার তাঁকে আর্থিক সমস্যার সমাধান হয়নি তখন ও বলিউড তাঁকে সম্মান দিলেও আর্থিক দিক থেকে সেই ভাবে সহযোগিতা করেনি। বহুদিন বলিউডে কাজ করার পরেও তাঁকে ভাড়াবাড়িতে থাকতে হতো। কিন্তু দক্ষিণের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পরে সে সমস্যা কিছুটা সমাধান হয়ে ছিল তার এবং তখন তিনি মুম্বইতে নিজের বাড়ি বানিয়ে ছিলেন।

আর তার সঙ্গে তাঁর বাবা মায়েরও বহু অপূর্ণ ইচ্ছে পূর্ণ করেছিলেন অভিনেতা। ১৯৯৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত দক্ষিণের ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন ছবি নিয়ে আশিস ব্যস্ত ছিলেন আর তখনই বলিউডে উঠে এসেছিলেন অনেক নতুন চরিত্রাভিনেতা। আর তাদের মধ্যে ছিলেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি, পঙ্কজ ত্রিপাঠী দের মত হেভিওয়েট তারকারা। আর বলিউডে নতুন ধরনের ছবি তৈরী করা হচ্ছে দেখে অভিনেতা আবার ফিরে আসতে চান, কিন্তু এ বার আর তার আগের মতো সুযোগ পান নি তিনি।






অভিনেতা বলেন তিনি দক্ষিণের ছবিতে অভিনয়ের জন্য চলে যাওয়ার পরে বলিউড আর সে ভাবে আর ডাকেনি। কিন্তু বর্তমানে অভিনেতা আবার ওটিটি মঞ্চে নতুন করে অভিনয় শুরু করেছেন। তিনি এখানে সুপারস্টারের তুলনায় হলেন প্রযোজন দক্ষ অভিনেতা। আর এর মাধ্যমেই টিন নমস্কার আবার বলিউডে উঠ এসেছেন প্রথম সারিতে। আর তাই ‘মৃত্যুদাতা’, ‘জিদ্দি’, ‘মেজর সাব’, ‘সোলজার’, ‘যমরাজ’, ‘অর্জুন পণ্ডিত’, ‘ত্রিশক্তি’-র এর ছবিতে দর্শকরা আবার ফিরে পেয়েছেন আশিসের মত এক অভিজ্ঞ ও দক্ষ অভিনেতাকে।

তিনি বিয়ে করেছেন অভিনেত্রী শকুন্তলা বড়ুয়ার মেয়ে রাজশ্রীকে। ব্যক্তিগত জীবনে অভিনেতা হলেন বাংলার জামাই। অভিনেতা জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও, বেছে নিয়েছেন এক বাঙালি তরুণীকে কারণ তার বাঙালি মায়ের প্রভাব তাঁর উপরে সব সময়ে গভীর। অভিনেতাকে পর্দার ভয়ঙ্কর খলনায়কের চরিত্রে দেখা গেলেও বাস্তব জীবনে তিনি এক জন মোটিভেশনাল স্পিকার। তাঁর অনুগামী ও শ্রোতারা অভিনেতার এক কথায় জীবনের মোটিভেশন খুঁজে পান। এমন কি আশিস মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে ও বিভিন্ন কর্পোরেট অফিসে যান। তিনি এই পেশার একজন সুবক্তা হিসেবে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়।

Leave a Reply